• চট্টগ্রাম
  • »
  • অধিনায়ক লেঃ কমান্ডার ফিরোজ জীবন দিয়ে রক্ষা করেছিলেন তার সহযোদ্ধাদের এবং তার জাহাজকে।

অধিনায়ক লেঃ কমান্ডার ফিরোজ জীবন দিয়ে রক্ষা করেছিলেন তার সহযোদ্ধাদের এবং তার জাহাজকে।

প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯, ৫:৩০ অপরাহ্ণ

সংবাদ প্রতিদিন২৪

বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর এমন একজন সাহসী অফিসারকে নিয়ে যিনি তার জীবন দিয়ে রক্ষা করেছিলেন তার অধীনস্হদের এবং তার জাহাজকে।

১৯ই সেপ্টেম্বর ২০০৬।
অপারেশন নির্মুলের জন্য “বানৌজা-শহীদ ফরিদ” প্রস্তুত।অধিনায়ক হিসেবে আছেন লেঃ কমান্ডার ফিরোজ কবির। খুলনার ভৈরব নদীতে বাঁধা তার জাহাজ।অভিযানে বের হওয়ার আগে শেষ মুহুর্তের নির্দেশনা জেনে নিলেন।এরও আগে পরিবারকে জানানো হয়েছে বিদায়। অর্পিত দায়িত্ব বুঝে নিয়ে তিনি জাহাজের ক্রুদের ইন্জিন চালু করার নির্দেশ দিলেন।৪৭ জন নাবিক সহ “বানৌজা-শহীদ ফরিদ” সাগরের উদ্দ্যেশ্যে রওনা হল। পাশে থাকা বানৌজা-মহিবুল্লাহ থেকে হাত উঁচিয়ে “বানৌজা-শহীদ ফরিদ” এর সকল সদস্যকে “বন ভয়াজ-যাত্রা শুভ হোক” চিহ্ন দেখানো হয়।

রুপসা নদীর স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে “বানৌজা-শহীদ ফরিদ”। সময়টা ছিল বর্ষাকাল,সাগর প্রচন্ড উত্তাল। সেদিনের ওয়েদার রিপোর্টে ” অল অকে ” দেখানোও হয়েছিল। ব্যারোমিটারেও সব স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। তবে ভূপৃষ্টের তাপমাত্রা নাবিকদের কাছে একটু অস্বাভাবিক বলে মনে হল। তবু তারা এগিয়ে যেতে থাকেন।কিন্তু কেউ তখনো ভাবতে পারেনি এই যাত্রাটি একটু পর দুঃস্বপ্ন হতে যাচ্ছে।

দিনের টহল শেষে জাহাজটি মংলার বোর পয়েন্টের অদুরে নোঙ্গর করে। বিকাল ৪টায় জাহাজের অধিনায়ক তার জাহাজের সর্বশেষ অবস্হান জানিয়ে বেজে বার্তা পাঠিয়ে দেয়।এর পরে স্বাভাবিকভাবেই বেজের সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। অন্যান্য স্বাভাবিক দিনের মত জাহাজের সব নাবিক মাগরিবের নামাজ শেষে একটু বিশ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এদিকে লেঃ কমান্ডার ফিরোজ কবির তার কেবিনে “অপারেশন নির্মুলের ” আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা করতে ব্যাস্ত।

রাত ৭-৮ টার দিকে হঠাৎই আবহাওয়া খারাপ হয়ে ওঠল।সাহায্যের জন্য জাহাজের অধিনায়ক বারবার বেজে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। আশ্চর্যজনক ভাবে কোন সিগন্যালই তখন আদান-প্রদান করা যাচ্ছিলনা।ঘন্টাখানেকের মধ্যেই প্রকৃতি তার চরম রুপ ধারণ করল।আকাশের রং পাল্টাতে শুরু করে দ্রুত।কালো থেকে আরো কালো হতে শুরু করে।বাতাসের গতি বাড়তে থাকে সমানে।জাহাজ নোঙ্গরে থাকা অবস্হায় সকল নৌ-সদস্য নিজ নিজ শেল্টার ষ্টেশনে অবস্হান গ্রহণ করে।এবার ঝড়টি সমস্ত শক্তি দিয়ে জাহাজে আঘাত হানা শুরু করল । এ অবস্হায় জাহাজ নোঙ্গর করে রাখা মানে নিশ্চিত বিপদ।ঝড়ের কবলে মুহুর্তেই উল্টে যেতে পারে।জাহাজের অধিনায়ক দ্রুত নোঙ্গর উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রচন্ড ঝড়,ঘুটঘুটে অন্ধকার,উত্তাল ঢেউয়ে নোঙ্গর উত্তোলন করাটা রীতিমত প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করার মত পরিস্হিতির সৃষ্টি করল। বেশ কিছু সময় চেষ্টা করে নোঙ্গর উত্তোলন করা হয়। নোঙ্গর উত্তোলন শেষে অধিনায়ক তার অভিজ্ঞ হাতে জাহাজটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্হান আকরাম পয়েন্টের দিকে চালিয়ে নিতে শুরু করেন।

সেসময় জোয়ারের কারণে সাগরের পানি পশুর নদে উত্তরমুখী হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।প্রচন্ড ঝড়ে স্রোতের বিপরীতে হওয়ায় জাহাজটি কোনমতেই কন্ট্রোলে আনতে না পেরে স্রোত ব্যবহার করে স্হান পরিবর্তনের টেকনিক এপ্লায় করেন অধিনায়ক। কিন্তু বোর পয়েন্টে এসে ত্রিমুখী উত্তাল ঢেউ এবং স্রোতের কবলে পড়ে হঠাৎ জাহাজটি পুরো আড়াআড়ি হয়ে যায়।জাহাজটি তখন ৪০-৫০° রোলিং করতে থাকে।অধিনায়ক বুঝতে পারলেন এখনই নোঙ্গর ফেলা না গেলে পরবর্তী ঢেউয়ে জাহজ সমেত উল্টে যাবে তার দল।যদি নোঙ্গর করা হয় তাহলে জাহাজ না উল্টানোর সম্বাবনা রয়েছে বা উল্টে গেলেও তার জাহজটি সাগর বক্ষে হারিয়ে যাবেনা।অধিনায়ক বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ তার উপর ৪৭ জন মানুষের প্রাণ এবং দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছে।

এই বিরুপ পরিস্হিতে তিনি কাকে নোঙ্গর করতে পাঠাবেন?মুহুর্তেই সিদ্ধান্ত নিলেন ।জাহাজ নোঙ্গর করার জন্য তিনি নিজেই ব্রিজ থেকে ফক্সলে উপস্হিত হলেন। জাহাজের কয়েকজন নাবিক অধিনায়ককে অপস রুমের পাশ দিয়ে গার্ড রেইল ধরে ফক্সলের দিকে যেতে দেখলেন। এটিই ছিল তার সাথে তার নাবিকদের শেষ সাক্ষাৎ।নোঙ্গর করার পর জাহাজ প্রবল ঢেউয়ে অত্যাধিক রোলিং করায় তিনি জাহাজ থেকে ছিটকে পড়েন পানিতে।মুহুর্তেই আগ্রাসী ঝড়ো স্রোত তাকে অন্ধকার গভীর সাগরে টেনে নিয়ে যায়।

এরপর জাহাজ আরো ঘন্টাখানেক ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকে।এক পর্যায়ে নোঙ্গর ওঠে গেলে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে।দুর্ঘটনাস্হল থেকে আরো ১২ নটিক্যাল মাইল দুরে এসে চরে আটকে যায় “বানৌজা-শহীদ ফরিদ”। অনেক চেষ্টার পর মধ্যরাতে জাহাজ থেকে VHF/UHFPA এর সাহায্যে অধিনায়ক এবং তাদের উদ্ধারের বার্তা প্রেরন করা হয় কমসেনে। বার্তাটি শুনে দ্রুত তাদের উদ্ধারে SAR অপারেশন চালানো হয়।প্রবল ঝড় উপেক্ষা করে এগিয়ে আসতে থাকে বেশ কয়েকটি নৌ-বাহিনীর জাহাজ আর অকুতোভয় নাবিকগণ। ভয়কে জয় করে সেদিন একেকজন নৌ-সেনা অতিমানব হয়ে ওঠেন।

ঝড় পুর্ন শক্তিতে আঘাত করে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোতে।প্রচন্ড ঝড়ে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে রেখেও অধিনায়ক এবং আক্রান্ত জাহাজকে উদ্ধার করতে তারা মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালান। অধিনায়ককে না পেয়ে বেজে বার্তা পাঠায় উদ্ধারকারীদল। এবার আকাশপথে উড়ে আসে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার।ততক্ষণে ঝড় কমে এসেছে। আলোর কোল,দুবলার চর,বোর পয়েন্ট,টাইগার পয়েন্ট, হংসরাজ, সহ উন্মুক্ত সাগরে তন্ন তন্ন করে খোজা হয় অধিনায়ক লেঃ কমান্ডার ফিরোজ কবিরকে। তাকে আর পাওয়া যায়নি।এই SAR অপারেশনটি ছিল নেভীর ইতিহাসে অন্যতম সবছেয়ে বড় SAR অপারেশন। একটি ফ্রিগেটসহ প্রায় ১০টি নৌ-বাহিনীর জাহাজ অংশ নিয়েছিল এই অপারেশনে।

এই ঘঠনার পর “বানৌজা-শহীদ ফরিদ” আবারো সাগরে নতুন মিশনে ফিরে আসে, কিন্তু আমাদের মাঝে আর কখনো ফিরে আসেননি অধিনায়ক লেঃ কমান্ডার ফিরোজ।

 



সর্বশেষ সংবাদ