• slide news
  • »
  • কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম আমাদের উচ্চশিক্ষা দর্শন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম আমাদের উচ্চশিক্ষা দর্শন

প্রকাশ : জুন ৮, ২০১৯, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বনাম আমাদের উচ্চশিক্ষা দর্শন

সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, নেছারাবাদ, পিরোজপুর।

কয়েক দিন আগে মাননীয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জনাব মোস্তফা জব্বার মহোদয়ের একটি বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে এসেছে যে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলা উচিত। মাননীয় কৃষি মন্ত্রী জনাব মোঃ আব্দুর রাজ্জাক মহোদয়ও সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। শিক্ষা ব্যবস্থার উপর নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এই আস্থাহীনতা প্রকৃতপক্ষে চাহিদা-যোগান চিত্রের হতাশাজনক দিকটি নগ্নভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে। এটিকে যদি আমরা হতাশার বটম-আপ এপ্রোচ হিসেবে অভিহিত করি, তাহলে বিষয়টিকে মাঠ পর্যায়ের চরম হতাশাজনক অবস্থার সারবেত্তা হিসেবে ধরে নেয়া যায়। আমাদের বেকারত্ব, প্রচলিত বিষয় বিন্যাস কর্তৃক উদ্যোক্তা তৈরি না করতে পারা, আমাদের যুবাদের কাজের সন্ধানে ভূমধ্যসাগরে ডুবে মরা, কোম্পানিগুলোতে চাকরি থাকতেও বিদেশীদের তুলনায় যোগ্য বিবেচিত না হওয়া ইত্যাদি খন্ডচিত্র একসাথে জুড়লে আমাদের শিক্ষা দর্শনের ত্রুটি প্রনিধানযোগ্য। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় চাহিদা পূরণে কতটুকু সক্ষম তা বিবেচনার দাবি রাখে।

কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরা যাক। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে মাঠ সহকারী পদে চাকরি প্রার্থীদের ভেরিফিকেশনের সময় দেখতে পেলাম, দেশের একটি নামী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পলিটিক্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স পাস করা একজন চাকরি প্রার্থী রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে একটি প্রকল্পে তৃতীয় শ্রেনির পদে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েটের চাকরির আকুতি আমাকে নাড়া দিয়েছে। এ যখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ পাস অনেক গ্রাজুয়েটের বিষন্নতার কাহিনীতে মফস্বলের বাতাস ভারী হয়ে আছে। তাদের শিক্ষা তাদের উদ্যোক্তা হতে দেয় নি, তাদের প্রচলিত পদ্ধতির শিক্ষা-উদ্বাস্তু বানিয়েছে। দেশজুড়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হাজার হাজার কলেজ থেকে আমরা এ রকম শিক্ষা-উদ্বাস্তু পাচ্ছি; অন্য ভাষায় বললে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছি।

চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ের এসি ল্যান্ড থাকা কালে একটি বিখ্যাত স্টিল উৎপাদনকারী কোম্পানির স্টাফ সম্পর্কে জানতে গিয়ে বুকটা মোচড় দিয়েছে; অফিসারদের একটি বড় সংখ্যায় বিদেশী, বিশেষ করে ভারতীয়। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কোম্পানিগুলো সীমান্ত বিবেচনা না করে যোগ্য কর্মী নেবে এটাই অনুমেয় কিন্তু দেশী-বিদেশী সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচার জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থার গোমর ফাঁস করে দেয়। আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় মানদন্ডের স্নাতক তৈরি করতে পারি নি বলেই সেই ভ্যাকুয়াম পূরণ করছে ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। এই অবস্থা দুটি চিত্র তৈরি করেছেঃ এক দিকে হাজার হাজার স্নাতক হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে অন্য দিকে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিগুলো আমাদের স্নাতকদের আত্মীকরণ করতে পারছে না। বাংলাদেশে হাজার হাজার ভারতীয় স্নাতকের চাকরি সংস্থান এবং বাংলাদেশ ভারতের চতুর্থ রেমিটেন্স সরবরাহকারী দেশ হওয়ার পিছনে শিক্ষা ব্যবস্থার নীতি নির্ধারকদের অদূরদর্শিতা ও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনমনীয়তা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে।

এবার আমাদের সেবা অর্থনীতির দিকে নজর দেয়া যাক। স্বাস্থ্য সেবায় আমদের প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট নেই, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে দক্ষ ল্যাব এসিস্ট্যান্ট নেই, ঔষধের দোকান চালানোর মত দক্ষ ফার্মাসিস্ট নেই। যা কিছু হচ্ছে তার বেশির ভাগই স্থানীয় উদ্যোগে অনেকটা নিয়ম-নীতি না মেনেই হচ্ছে। অন্যদিকে ভূমি ব্যবস্থাপনার অতি প্রয়োজনীয় অংশ সার্ভেয়ারের সংকট ভূমি সেবাকে আরাধ্য মানদন্ডে তুলতে পারছে না; বেশির ভাগ ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার নেই। অথচ স্থানীয় পর্যায়ে ভূমি বিরোধ নিরসনে সার্ভেয়ারের ব্যাপক চাহিদা বিদ্যমান আর এই চাহিদার যোগান দেশজুড়ে মাত্র দুইটি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্ভব নয়। আবার গ্রাম পর্যায়ে যে মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি শিল্প আমাদের আমিষের চাহিদা পূরণে ব্যাপক অবদান রাখছে, সেই শিল্পের সমস্যা বা উন্নয়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো আঞ্জাম দেয়ার কাজ করছে স্থানীয় হাতুড়ে পল্লী প্রাণি-চিকিৎসক বা ঔষধ/পশুখাদ্যের দোকানদার। এভাবে প্রায় সকল টেকনিক্যাল ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর চাহিদা অনেক, কিন্তু আমাদের প্রচলিত প্রতিষ্ঠান থেকে যোগান খুবই নগন্য।

এর জন্য মূলত দায়ি স্নাতক ও ডিগ্রী পর্যায়ে আমাদের ব্রিটিশ যুগের পাঠ্যক্রম অর্থাৎ বিষয় বিন্যাস। এ বিষয় বিন্যাস অনেকাংশে উৎপাদনশীল কর্মমুখী স্নাতক তৈরির অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। অপরদিকে উন্নত বিশ্বে বিষয় গড়াপেটা হরহামেশাই হচ্ছে। প্রযুক্তির বিকাশ এবং চাহিদার প্রয়োজনে আদি বিষয়গুলো ভেঙে সঙ্কর বিষয় বা নতুন বিষয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে জায়গা করে নিচ্ছে। এতে রাষ্ট্র তার চাহিদা মোতাবেক কর্মীর যোগান পাচ্ছে এবং বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারছে। এই দূরদৃষ্টির পরিচয় দিতে পারছে বলেই পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিকে যাচ্ছে এবং স্নাতকরা বিশ্বের বিভিন্ন পরিমন্ডলে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, চায়না কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তায় (artificial intelligence or AI) নিজেদের ভবিষ্যত বিশ্বের চালক হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য দেশজুড়ে প্রায় ১০০ টি প্রতিষ্ঠান (AI institutes) স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। ২০১৭ সালে চায়না “নিউ জেনারেশন আরটিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান” নামক একটি মাস্টারপ্ল্যান ঘোষণা করে এবং এমআইটি টেকনোলজি ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের মতে আগামী দুই বছরের মধ্যে চায়না ইউএসএকে এআই গবেষণায় ছাড়িয়ে যাবে। আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াও চায়নার সাথে পাল্লা দিয়ে এআই সাবজেক্ট খুলছে। তারা জানে সামনের পৃথিবী পরিচালিত হবে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এবং হাতঘড়ি থেকে শুরু করে ফ্লোর ক্লিনার, তা থেকে সমস্ত ইলেকট্রনিক যন্ত্রে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত হবে। ফলে সেই সময় চায়নিজরা হবে বিশ্বনেতা (global leader) আর বরাবরের মতো আমরা হবো শুধু কনজিউমার।

এভাবে আমাদের লক্ষ লক্ষ মেধাবি মুখ শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় পলিসির অভাবে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারবে না, বরং রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে থাকবে। অথচ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পেলে আমাদের ছেলেরা দেখিয়ে দেয় যে আমরা মেধা বিকিরিণে কৃপণ নই। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ স্নাতক কলেজ ও ডিগ্রী কলেজগুলোতে দর্শন, সাচিবিক বিদ্যা, পলিটিক্যাল সায়েন্স, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সমাজকল্যাণ, ভূগোল, ম্যানেজমেন্ট, ইসলামের ইতিহাস, বোটানি, যুলোজি প্রভৃতি বিষয়ে যে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে, কর্মমুখী শিক্ষার মানদন্ডে তারা কতটুকু প্রয়োজনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে উঠছে তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই বিষয়গুলোর প্রয়োজনীয়তা আস্বীকার করা উদ্দেশ্য নয়; যে সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা এসব বিষয় অধ্যয়ন করছে সেটা চাকরির বাজারে গিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা বিকল্প না পেয়ে এ সকল অনুৎপাদনশীল বিষয়ে অধ্যয়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। চায়নিজরা যখন ব্যাপকাকারে রোবটিক্স নিয়ে কাজ করছে তখন আমাদের ছেলেরা পড়ছে সিরাজউদ্দৌলা কেন পরাজিত হলেন?

সম্প্রতি ময়মনসিংহ বিভাগে নতুন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালু হয়েছে। নবনিযুক্ত ভিসি মহোদয়সহ অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় বিন্যাসের যে উদ্যোগ দেখলাম তাতে যারপরনাই উদ্বিগ্ন না হয়ে পারলাম না। ভিসি মহোদয় বাংলার লোক; তার মাথায় প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা চিন্তার দৌড় ও একই সাথে দূরদর্শিতা যে উদ্বেগজনকভাবে সীমিত তা বোধগম্য হতে দেরি হলো না। সবাই এতেই আপ্লুত ছিলেন যে সেখানে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে; এই বিশ্ববিদ্যালয়ও যে শিক্ষা-উদ্বাস্তু তৈরির নিয়ামক হতে পারে তাতে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।

প্রযুক্তিহীন শিক্ষার কারণেই আমাদের ঘরে ঘরে ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে না, উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। অথচ আমাদের গ্রাম্য যুবকরা সীমিত প্রশিক্ষণ নিয়েই পোল্ট্রি পালন, মাছ চাষ, গরু মোটাতাজাকরণ প্রভৃতি খামার করে গ্রামের অর্থনীতি পালটে দিতে এবং আমিষের চাহিদা পূরণে একচ্ছত্র ভূমিকা রেখেছেন। এই যুব সমাজ প্রযুক্তি বিষয়ে পড়াশুনা করলে নিজেরা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠত এবং একটি বাড়ি একটি কারখানা হিসেবে প্রান্তিক অর্থনীতির রূপ বদলে দিতে পারত। প্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষাকে মূল ও সাপোর্ট সার্ভিস উভয়ের সাথে যুক্ত করার পরিকল্পনাও করতে হবে। কারণ টেকনিক্যাল গ্রাজুয়েট তৈরির সাথে সাথে সাপোর্ট সার্ভিসের এন্তেজাম করা রাষ্ট্রের শ্রেয়তর প্রয়োজনীয়তা। বেশ কিছু সংখ্যক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই চাহিদার যোগান পাওয়া যায় না, চাহিদার যে ব্যাপকতা যোগান পেতে হলে প্রযুক্তি শিক্ষাকে এলিট লেভেলে না নিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্নাতক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের সময়োপযোগী শিক্ষা দর্শনই তৈরি হয় নি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উচ্চ শিক্ষা দর্শন অনেকটা ব্রিটিশ আমলের কেরানি তৈরির দর্শন, আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষা দর্শন হলো রাষ্ট্রের সম্পদের উপর আমলা শ্রেনিভুক্ত হওয়া এবং জনগণ থেকে আলাদা হয়ে এলিট হওয়ার মর্যাদায় আবিষ্ট হওয়া। জাতির প্রয়োজন ভিত্তিক পাঠ্যক্রম আমরা কখনও ভাবি নি। জনসংখ্যা আর প্রয়োজন বিবেচনায় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা থ্রি ইডিয়টস সিনেমার পুংচুখ ওয়াংলোর স্কুলের মতই হওয়া দরকার যেখানে প্রযুক্তি শিক্ষানির্ভর উদ্যোক্তার জাগরণ ঘটবে। আর বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলে এই পাপ থেকে প্রায়শ্চিত্ত করা দরকার।

 



সর্বশেষ সংবাদ
বরগুনায় প্রধান শিক্ষকের ব্যাপক অনিয়ম, এলাকাবাসীর ক্ষোভ প্রকাশ স্বরূপকাঠীতে পয়ঁত্রিশজন জুয়াড়ী আটক “শিশির ভেজা রাত” রওশন কবীর নেছারাবাদে(স্বরূপকাঠী) কমিউনিটি পুলিশিং ও ওপেন হাইজ-ডে অনুষ্ঠিত বরগুনায় কোচিং বানিজ্য বন্ধে নেই কোনো পদক্ষেপ স্বরূপকাঠীতে  লবন মজুদের জন্য ভ্রাম্যমান আদালত- বিশ হাজার টাকা জরিমানা রিফাত হত্যা : প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠন ২৮ নভেম্বর। তিন আসামির জামিন নামঞ্জুর স্বরূপকাঠীতে বুলবুলের আঘাতে বসত ভিটা কেড়ে নিল আবু হানিফের মরণফাঁদ দিয়ে উঠতে হয় খেয়া পারাপারে , অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে যাত্রীদের থেকে!! বরগুনা রিফাত হত্যা : প্রধান আসামির স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের আবেদন