• slide news
  • »
  • শ্রম বিক্রি করা নারীরা বৈষম্যে শিকার

শ্রম বিক্রি করা নারীরা বৈষম্যে শিকার

প্রকাশ : ডিসেম্বর ৭, ২০১৮, ১:৪৫ অপরাহ্ণ

শ্রম বিক্রি করা নারীরা বৈষম্যে শিকার
এসএস সরোয়ারঃ
গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন সুবিধা প্রকল্পে ক্ষুদ্র,কুটির, হস্ত ও কারুশিল্প পণ্যের নকশা-নমুনা উন্নয়ন ও গবেষণা কাজে ১৯৫৯ সালে যে প্রতিষ্ঠানটি দায়িত্ব গ্রাহন করে সেটি আজ বিসিক শিল্প নগরী নামে পরিচিত। পল্লী অঞ্চলের উন্নয়নের লক্ষে, শ্রমজীবি নারীদের আত্মনির্ভরশীল ও কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতির ৬২ ও ৬৩ নং অধ্যাদেশ দ্বারা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)-কে ৩টি পৃথক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করে। এর একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। জাতিসংঘের সংগঠন ইউনিডো প্রণীত ম্যানুয়েলের আলোকে ইপসিক এ সময় দেশের ১৭টি জেলায় এ প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন । এ পরিকল্পনার আওতায় ১৯৬১ সনে পিরোজপুর জেলার স্বরুপকাঠি উপজেলায় সন্ধ্যা নদীর পাশ ঘেষেঁ গড়ে উঠা ক্ষুদ্র কুঠির শিল্প, যা বিসিক শিল্প নগরী নামে অবস্থিত। নারী শিল্পোদ্যোক্তা উন্নয়ন, গ্রামীন দারিদ্র বিমোচন, দিনমজুর নারী-পুরুষদের আয়বর্ধক কর্মকান্ডে সফলতা করা, পল্লী অঞ্চলে শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে তেজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থা উন্নয়নই এ প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য। হাজারো ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রম বিক্রি করা নারীর সংখ্যা লক্ষ্যধিক। কিন্তু তাদের অভিযোগ, একই সময়ে কাজ শুরু ও শেষ করে সমপরিমান কাজ শেষে পুরুষের চেয়ে কম মজুরি পাচ্ছেন তারা। একই অভিযোগ দক্ষিণাঞ্চলে পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলা ও উপজেলায় নারী শ্রমকদের। মাটিকাটা, রাস্তা তৈরী-সংস্কার, ক্ষেত-খামার, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প,বিসিক নগরীসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের সমান শ্রম দিয়েও মজুরি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পরিবারে উপার্জন প্রধান যখন নারী তখন এ আর্থ দিয়ে সংসার চালাতে খুব কষ্ট হয় বলে জানান,স্বরুপকাঠির ক্ষুদ্র কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানের ছোপড়া মিলের নারী শ্রমিক আঞ্জুযারা বেগম। স্বরুপকাঠির বিসিক শিল্প নগরী ঘুরে দেখা গেছে,সকাল ৮টায় নারী-পুরুষ কাজের হাজিরা দিয়ে বিকেল ৫/৬ টায় সমপরিমান কাজ শেষে পুরুষ শ্রমবিক্রি করে পাচ্ছেন ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা একই কাজে এক জন নারী শ্রমবিক্রি করে পাচ্ছেন ২০০ থেখে ২৫০ টাকা। পিরোজপুরের নাজিরপুর, ভান্ডারিয়, মঠভাড়িয়ারসহ বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে নারী শ্রমিকদের মজুরির বৈষম্যতা এ চিত্র দেখ গেছে, চাতালের নারী শ্রমিকদের হাজিরা ৭০ থেকে ৮০ টাকা। একই কাজে পুরুষ শ্রমিকরা শ্রম মজুরি পাচ্ছেন প্রায় এর দ্বিগুন। তবে এ সব এলাকায় পুরুষ মজুর সংকট থাকায় গৃহস্থরা নারী শ্রমিক দিয়ে অল্পখরছে ক্ষেত-খামারে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ইরি-বোরো ধানক্ষেত-খামারে আগাছা পরিস্কার থেকে শুরু করে ইটভাটা, আলুক্ষেত ও চাতালসহ প্রভ’তি স্থান দখল করে নিয়েছে নারী শ্রমিকরা। পুরুষের পাশাপাশি দেশ উন্ন্য়নে
কোন অংশে কম নয় নারী সমাজ। কিন্তু শ্রম মজুরির ক্ষেত্রে পুরুষের দ্বারে-কাছেও নেই নারীরা। সরকারের নারী শ্রমমজুরি আইন থাকা সত্তে¡ও নেয্য শ্রমমূল্য না পাওয়া ক্ষিপ্ত নারী শ্রমিকরা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর নারী বৈষম্য দূরীকরণের সনদ অনুমোদন করা হয়। ১৯৯৫ সালে বেইজিংএ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ^ নারী সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশে^র ১৮৯টি দেশ নারী প্রগতি ও উন্নয়ন সমতার বাধা হিসেবে ১২টি বিষয় বিবেচনা করে এবং তা থেকে উত্তরণের কৌশল ও সরকারি-বেসরকারি স্তরে সংশ্লিষ্ট সকলের করণীয় নিদিষ্ট করে কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হলেও তাও পুরাপুরি বাস্তবায়ন হয়নি।। কর্মপরিকল্পনার শর্তানুসারে বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’ঘোষণা করলেও সঠিকভাবে এটিও কার্যকারির আওতায় আসছেনা। এতসব আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যর্থতায় শ্রমজীবি নারীর দিন মজুরির বৈষম্যতা ক্রমেই বেড়ে চলছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রেই শ্রমজীবি নারীর স্ব-উজ্জ্বল ভুমিকা থাকলেও শ্রমমূল্যে বঞ্চিত হ্চ্ছ তারা। দেশীয় হস্ত ও কুটির শিল্প প্রসারের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে ১৯৬০ সাল থেকে বিসিক বাঁশ-বেত, মৃৎ শিল্প, চামড়্,া বøক প্রিন্ট, বাটিক, স্ক্রি প্রিন্ট, পুতুল তৈরি, প্যাকেজিং, বুনন ও ধাতব শিল্পে প্রশিক্ষণ কর্মসুচিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অগ্রাধিকার রয়েছে প্রাধান্য। বিসিক শুরু থেকে জৃলাই ২০১১ পর্যন্ত বিভিন্ন ট্রেডে বিসিক প্রধান কার্যালয়ে অবস্থিত নকশা কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের ১৯৭১৫ জন নারী ও ২৭১২ জন পুরুষ, যা পুরুষের তুলনায় ১৮০০৩ জন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তনারী সংখ্যা বেশী রয়েছে। এসব নারী শ্যমিক দ্বারা দেশের শিল্পায়ন, আত্মকর্মসংস্থান ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটছে। এছাড়াও কুটির ও গ্রামীণ শিল্প উন্নয়ন (সিআরআইডিপি) নামে ৩টি প্রকল্পের কার্যক্রমে জুলাই ১৯৭৪ থেকে জুন ২০০৫ সাল পর্যন্ত সিআইডিপি প্রকল্পের আওতায় ১০৬২৩ জন নারী ও ২৬৫৬ জন পুরুষ যা পুরুষের চেয়ে ৭৯৬৭ জন বেশী নারীকে স্থানী ও ভ্রাম্যমান প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামীণ পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিসহ দারিদ্র্য দূরীকরণ করার আওতায় আনা হয়েছে (এ শুধু ১টি বিসিকের তথ্য)। এর পরেও মজুরির ক্ষেত্রে অবহেলিত নারী শ্রমিকরা। স্বরুপকাঠির বিসিক নগরীর ক্ষুদ্র কুটির শিল্প নারিকেলের ছোপড়া কারখানায়।
স্বামী পরিত্যক্ত আলেয়া বেগম চার সন্তানের জননী। বয়স ৪০ কী ৪২ বছর। মজুরি বৈষম্যেতায় শিকার নারী শ্রমিকদের মধ্যে তিনিও এক জন। সারা দিন শ্রম শেষে পড়ন্ত বিকেলে নিতে আসা মজুরীর বৈষম্যতা নিয়ে তার যত আক্ষেপ। প্রায় সন্ধ্যা কণকনে শীত কোনো রকমে এলমেলো পেছানো জীর্ণ কাপড়ে দাড়িয়ে আছে মজুরি নিতে আসা আলেয়া বেগম। সারা শরীরে শ্রমের চিহ্ন, খিড়-খিড়ে মেজাজে আর ছলছলে জোড়া জলচোঁখের ক্ষীণ কান্না কন্ঠে মিড়িয়া কর্মীদেরকে বল্লেন, “ এই দেখেন না, দেড়শো টাকা সারা দিন কাজ করাই মোরে দেছে, একই কামে সুমইন্নার বাব রহমাইনারে দেছে চারশো টাহা, মোগোরে এ রকমেরেই ঠগায়ায় ওরা। তিনি ভারাক্রান্তে কন্ঠে আরও বলেন, চারশো টাহা এক দিনে মোর কামাই হইলে মাইয়া-পোলার লগইয়া চাউল-ডাল কেনার পর মোর কোমর ব্যথার ঔষুধও কেনতে পারতাম, দেড়শো টাহা দিয়া মুই কি যে করুম, আবার প্রায়ই মাসে ১০দিন কাম থাকে না। সংসারে রোগ বালাই তো লেগেই আছে, কিদিয়া ঔষুধ কিনুম আর কী খাইয়া যে বাচুম হেইয়া মুই জানি না রে, বাজান”? মজুরি নিতে আসা বিভিন্ন পেশায়া জড়িত নারী শ্রমিকরা চাপা কষ্টে এভাবে বলেন, আরো অনেকে।

 



সর্বশেষ সংবাদ