• slide news
  • »
  • হারিয়ে যাচ্ছে বসন্তের আমেজ

হারিয়ে যাচ্ছে বসন্তের আমেজ

প্রকাশ : মার্চ ৬, ২০১৯, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

সংবাদ প্রতিদিন২৪#

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের আবহাওয়া। শীতকাল চলে গেছে। চলছে বসন্তকাল। অথচ বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এখন কখনও শীতের অনুভূতি, কখনও গ্রীষ্মের আবহাওয়া। আবার কখনও ঝড়ো হাওয়াসহ বজ্রপাত আর শিলাবৃষ্টি। কিছুটা আবার বর্ষাকালেরও আবহ রায়েছে। কালো মেঘে ঢাকা পড়ছে আকাশ। একটানা বৃষ্টি পড়ছে। জলবায়ুর প্রভাবে শীত আর গ্রীষ্মের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে বসন্তের আমেজ।
খনার বচন অনুযায়ী, “যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্য দেশ।” অর্থাৎ মাঘের শেষে যদি বর্ষণ হয় তাহলে ফুলে ফসলে ভরে উঠবে দেশ। বসন্তে সজীব থাকবে আবহাওয়া। কিন্তু, বেশ কয়েক বছর ধরেই আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে প্রকৃতিতে বসন্ত এখন খুঁজে পাওয়াই দায়। যদিও এই অবস্থায় আমের মুকুলের ক্ষতি হলেও এমন আবহাওয়া অন্য ফসলের জন্য লাভজনক বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা। অন্যদিকে, ঠান্ডা আর গরম এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্বাসনালীজনিত অসুখ, পানিবাহিত রোগ আর মশাবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, আবহাওয়ার আগে একটি নির্দিষ্ট সময় ছিল। এ রকম আবহাওয়াটা আসতো বৈশাখ মাসে। এপ্রিলে একটু একটু বৃষ্টি হতো, কালবৈশাখী হতো, ঘূর্ণিঝড় হতো। ওই সময় শিলাবৃষ্টিও প্রচুর হতো। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অর্থাৎ বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসে এই প্রভাবটা ছিল। কিন্তু, এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। উষ্ণতার কারণে বাতাসের যে নির্দিষ্ট বলয় সেটির পরিবর্তন হচ্ছে। এবার উত্তর মেরুর বাতাস উত্তর মেরু থেকে স্থানান্তরিত হয়ে আমেরিকার উত্তরাংশে চলে আসে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাতে তাপমাত্রা অনেক কমে গিয়েছিল। তিনি বলেন, গত ৫০ বছরে যে এমন আবহাওয়া আসেনি তা নয়। কিছু কিছু অনিশ্চয়তা থাকেই। কোনও বছর বৃষ্টি ১৫ দিন পরে নামে, কোনও বছর আবার ১৫ দিন আগেই নামে। কোনও বছর নির্দিষ্ট সময়ে নামে। এই বছর এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে তা ফাল্গুন শেষের বৃষ্টি। এই বৃষ্টি মাঘের শেষে হলে ভালো হতো। এ বছর সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে শিলাবৃষ্টি। যা জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কযুক্ত বলে আমি মনে করি। এই শিলাবৃষ্টি হওয়ার কথা বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের কিছু আলামত আছে। এই যে ঠান্ডা-গরম অনুভূতির যে অনিশ্চিত অবস্থা সেটি জলবায়ুর প্রভাবেই হচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। ফলে এটা মনে রেখেই আমাদের জলবাযু পরিবর্তন মোকাবিলার পরিকল্পনা করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব এখন একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। ২০৩০ সালের দিকে গিয়ে এর প্রভাব আরও প্রকটভাবে বোঝা যাবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ঋতু পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, এখন দেখা যায় বর্ষার শুরুতেই বৃষ্টি শুরু হয়। এরপর বর্ষার পিক সময়ে বৃষ্টি কমে যায়। আবার বর্ষার শেষে বৃষ্টি হয়। তার মানে আষাঢ় শ্রাবণ চলে আসছে বৈশাখ জ্যৈষ্ঠে। ২০১৭ সালে চৈত্র মাসে বৃষ্টি হয়েছে আষাঢ় মাসের মতো, আবার ভাদ্র-আশ্বিন বা কার্তিক মাসে বৃষ্টি হচ্ছে শ্রাবণ মাসের মতো। যেহেতু বর্ষা সরে গেছে, শরৎকালও সরে গেছে। হেমন্ত এখন নাই বললেই চলে। শরৎ আর হেমন্তকাল এখন মিশে গেছে। এরপরে শীতকাল ঠিকই আছে, ঠান্ডা পড়ছে। কুয়াশা হচ্ছে। কিন্তু বসন্ত আগের মতো নেই। বসন্তেই বৃষ্টি হচ্ছে। কালবৈশাখী হচ্ছে, শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। ফলে গ্রীষ্মের প্রভাব দেখা যাচ্ছে সেখানে।
এদিকে, বর্তমানে বাংলাদেশের আবহাওয়ার বিষয়ে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, পশ্চিমা লঘুচাপের সঙ্গে পূবালী বাতাসের সংমিশ্রণে ঘন মেঘের সৃষ্টি হয়। প্রতিবছর গ্রীষ্মে এই ধরনের মেঘের আবির্ভাব ঘটে। এবার একটু আগে আগেই ঘটে। এই মৌসুমে এই মেঘ মাঝে মাঝেই দেখা যায়। সঙ্গে বাতাসের প্রভাব থাকে। এই ধরনের আবহাওয়া এবারই প্রথম নয়। কয়েকবছর পর পর এই ধরনের আবহাওয়া দেখা যায়।
আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬২ ভাগ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় মৃদু শৈত্য প্রবাহ বয়ে গেছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি দেশের সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়, মার্চ মাসে সামগ্রিকভাবে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা আছে। এ মাসের দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে এক থেকে দুই দিন মাঝারি বা তীব্র কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় ও দেশের অন্য এলাকায় ২ থেকে ৩ দিন হালকা বা মাঝারি কালবৈশাখী বা বজ্রঝড় হতে পারে। এর পাশাপাশি বাড়তে থাকবে তাপমাত্রা। এ সময় দিনের তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বেড়ে প্রায় স্বাভাবিক (৩৪ থেকে ৩৬) ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৭ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
এই আবহাওয়া ফসলের ওপর কী প্রভাব ফেলবে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কৃষি উইং এর পরিচালক এস এম হাছেন আলী বলেন, ‘এই আবহাওয়া বোরো ধানের জন্য খুবই ভালো। সেচ কম লাগছে। ডিজেল আর বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। এতে সারও কম লাগবে বলে তিনি জানান। একই কারণে আখ ও গমের ফলনও ভালো হবে বলে তারা আশা করছেন।
হাছেন আলী বলেন, সরিষা মাঠে নেই বললেই চলে। আর মসুরের দানা উঠতে শুরু করেছে। এই দুই শস্যের কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। তবে সব মিলিয়ে ক্ষতির চেয়ে লাভের পরিমাণ বেশি।
আমের মুকুলের বিষয়ে তিনি বলেন, খুব ঘন কুয়াশা না হলে মুকুলের তেমন ক্ষতি হবে না। বরং এই ববৃষ্টিতে রোগ জীবাণু আর ক্ষতিকর পোকামাকড় ধুয়ে যাবে। এতে মুকুলের সেটিং আরও ভালো হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তবে কৃষিবিদ এস এম হাছেন আলীর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আইনুন নিশাত বলেন, ‘এ বছর আমের মুকুল এসেছে তিন থেকে চার সপ্তাহ আগে। ফলে আগাম শিলাবৃষ্টির কারণে আমের মুকুলের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এই হারে শিলা পড়লে আমের ফলন ভালো নাও হতে পারে বলে তার আশঙ্কা।
কৃষি তথ্য অধিদফতরের মতে, বৃষ্টিতে আমের মুকুল পোকা ও জীবাণুমুক্ত হবে। এতে ফলন বাড়বে।
এদিকে, আবহাওয়ার এই বৈরী আচরণ স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এ বি এম আব্দুল্লাহ জানান, বর্তমানে যে আবহাওয়া এই ঠান্ডা এই গরম-এতে মূলত সমস্যা হয় শ্বাসযন্ত্রের ওপরে। যাদের আগে থেকে অ্যাজমা আছে, ব্রংকাইটিস আছে তাদের সমস্যা বেড়ে যায় এই সময়ে। সর্দি কাশি বেড়ে যেতে পারে। টনসিলাইটিস হয়। বিশেষ করে শিশুদের এই সময় শ্বাসনালীর সমস্যা বেশি হচ্ছে। বয়স্কদের ঝুঁকি একটু বেশি। এ সময় এ ধরনের সমস্যা বেশি হয়। এছাড়া কিছু জ্বর যেমন টাইফয়েড, প্যারা টাইফয়েডও হচ্ছে এখন। এ ধরনের রোগ থেকে বাঁচতে কী করতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাইরে ঘোরাফেরা কম করতে হবে। যদি বাইরে যেতেই হয় সেক্ষেত্রে ধুলাবালি থেকে দূরে থাকতে হবে। বাইরের খোলা খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। এই সময় গরমে অনেকে বাইরের শরবত বা পানীয় জাতীয় জিনিস খান যা খুব অস্বাস্থ্যকর। এসব এড়িয়ে চলতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. সানিয়া তাহমিনা বলেন, এই সময় শ্বাসনালীর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। এছাড়া চিকেন পক্স হতে পারে। এজন্য বাইরে বের হলে মুখে মাস্ক পরে বের হলে ভালো। তিনি বলেন, পানিবাহিত রোগ এ সময় বেড়ে যায়। বিশেষ করে রোটা ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া বেশি হয়। তাই পানির বিষয়ের সতর্ক থাকতে হবে। বৃষ্টির কারণে পানি জমে মশা বেড়ে যায়। এতে মশাবাহিত রোগ হতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এই বিষয়েও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

 



সর্বশেষ সংবাদ